বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৪ অক্টোবর ২০১৭

আধুনিকায়নে লাভজনক হবে সরকারি চিনিকল


প্রকাশন তারিখ : 2017-10-04

ফারজানা লাবনী   

৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করে দেশের চিনিকলগুলোকে লাভজনক করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি)। এ জন্য সরকার দেশের ১৫টি চিনিকলের আধুনিকায়ন ও বহুমুখীকরণে সংস্কারে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানালেন বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেন।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি চিনিশিল্পের উন্নয়নে নানা কর্ম পরিকল্পনার কথা জানান।

চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তর ছেড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছুটে বেড়িয়ে ১৫টি চিনিকল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এ কে এম দেলোয়ার হোসেন। চিহ্নিত করেছেন চিনিকলের প্রকৃত সমস্যাগুলো। আখ চাষিদের ঘরের দরজায় হাজির হয়েছেন তিনি। তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন। চিনিকলের কেউ আখ চাষিদের হয়রানি করলে তা সরাসরি জানাতে নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। সরকারি চিনিকলের আধুনিকায়নে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে চলেছে এবার। এভাবে সরকারি চিনিকলের উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি।

এ কে এম দেলোয়ার হোসেন স্কুল এবং কলেজের পাঠ শেষে কিশোরগঞ্জ থেকে রাজধানীতে আসেন পড়ালেখা করতে।

মেধাবী দেলোয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স শেষে এফসিএম ডিগ্রি নেন। ১৯৮৫ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তাবানী বেভারেজে অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান ঢাকা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে ডেপুটি চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। ১৯৯২ সালে তাঁকে বিএসএফআইসির সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। নতুন নতুন চাকরির সুযোগ এলেও চিনিশিল্প ছেড়ে কোথাও যেতে মন চায় না এ কে এম দেলোয়ার হোসেনের। শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০১৪ সালে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে এ কে এম দেলোয়ার হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘২০১৪ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল বিএসএফআইসির আওতাধীন বিভিন্ন চিনিকলের গুদামে পড়ে থাকা অবিক্রীত চিনি বিক্রি করা। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর নির্দেশে এসব চিনি বিক্রিতে বিভিন্ন কৌশল নেওয়া শুরু করি। সরকারি চিনিকলগুলোতে উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কমে চিনি বিক্রি করা হতো। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুনভাবে সরকারি চিনিকলের চিনির দর নির্ধারণ করি। ’

বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করি। অপরিশোধিত চিনি (র সুগার) আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই একমতে পৌঁছান। সরকারি চিনিকলে উৎপাদিত চিনির দর ৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪ টাকা নির্ধারণ করি। এরপর ৪৮ টাকা। শেষ পর্যন্ত মিল গেটে চিনির দর ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছি। সরকারি চিনি বিক্রির কৌশলে পরিবর্তন আনি। উন্নতমানের প্যাকেটে করে চিনি বিক্রিতে উদ্যোগ নিই। মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় শপিং মলে সব জায়গায় ছড়িয়ে দিই সরকারি চিনি কলের চিনি। সরকারি চিনির চাহিদা বাড়তে থাকে। গুদামে পড়ে থাকা সব সরকারি চিনিকলের চিনি বিক্রি হয়ে যায়। এসব চিনি বিক্রি করায় সরকারের অতিরিক্ত আয় হয় ৩৪০ কোটি টাকা। এসব চিনি বিক্রি করতে সক্ষম হওয়ায় চিনিশিল্প বড় ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পায়। ’

এ কে এম দেলোয়ার হিসাব কষে জানান, রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) এবং ভ্যাট আরোপের আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির বিপরীতে সরকারি রাজস্ব আয় হয় প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা। রাজস্ব আরোপের পরে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ২১ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৮ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির বিপরীতে সরকার প্রায় ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব আয় করে। এর পরের বছর ২১ লাখ ৩ হাজার ৪১৫ টনে তা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২৬৫ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির ফলে সরকারের রাজস্ব আয় হয় প্রায় ১ হাজার ৩৪৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের তুলনায় চিনির দাম এখনো কম এমন অভিমত ব্যক্ত করে এ কে এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১১ সালে চিনির দর ৬০ টাকা নির্ধারণ ছিল। ২০১৭ সালেও চিনির দর ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ ভোক্তারা এ দরেও সরকারি চিনিকলে উৎপাদিত চিনি কিনছে। গত রমজানেও সরকারি চিনি বাজারে ছাড়া মাত্র বিক্রি হয়েছে।

বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি প্রত্যেকটি চিনিকলে গিয়েছি। সেখান কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। দীর্ঘ বৈঠক করেছি। আখ চাষিরা চিনিকলের প্রাণ। তাদের বাড়িতে গিয়েছি। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানে পথ খুঁজেছি। চিনিকলে পুরনো পদ্ধতি ব্যবহার করে ওজনে কারচুপি করা হতো। এতে চাষিরা বেশি আখ দিয়েও কম টাকা পেত। আখ চাষিরা সময়মতো আখ বিক্রির অর্থ পেত না। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ অর্থ দিতে চাষিদের হয়রানি করত। মাঠে কাটার উপযোগী হলেও আখ যথাসময়ে চিনিকলে সরবরাহে অনুমতি পেত না। পুরনো যন্ত্রপাতিতে চিনিকলের উৎপাদন খরচ বেশি হয়। দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সততায় নিশ্চিত করায় মনোযোগ দিই। এসব সমস্যার সমাধানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, শিল্পসচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করি। শিল্পমন্ত্রীর নির্দেশে চিনিকল পরিচালনায় ম্যানুয়াল পদ্ধতি ছেড়ে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ’

তিনি বলেন, আখ চাষিদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানে ই-গেজেট, ই-পুঁজি চালু করা হয়। আখ চাষিরা আখ বিক্রির অর্থ যথাসময়ে পেত না। বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতো। এ সমস্যার সমাধানে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। যা ই-ক্যাশ নামে পরিচিত। আখ ওজনে কম দেওয়া হতো। এ সমস্যার সমাধানে ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহূার সরু করা হয় বিভিন্ন চিনিকলে।

বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান দোলোয়ার হোসেন বলেন, চিনিকলে ই-ক্যাশ, ই-গেজেট, ই-পুঁজি এবং ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। এতে আখ চাষিদের হয়রানি অনেকাংশে দূর হয়েছে। আখ চাষিরা আখ চাষে উৎসাহ পাচ্ছে।

‘শুধু আখের ওপর নির্ভর করে চিনিশিল্প টিকে থাকা সম্ভব নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিনিকলগুলো বহুমুখীকরণে নির্দেশ দিয়েছেন। স্বাধীনতার পরে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় করেছেন তিনি চিনিকলগুলোর জন্য। পর্যায়ক্রমে সরকারি চিনিকলগুলো আধুনিক ও বহুমুখীকরণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে নর্থ বেঙ্গল এবং ঠাকুরগাঁও চিনিকলে বহুমুখীকরণে যাচ্ছি। এরই মধ্যে এ দুই মিলের জন্য ৮১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ’ বললেন এ কে এম দেলোয়ার।

বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান বলেন, ৮১২ কোটি টাকার মধ্যে নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের জন্য ৩২৫ কোটি টাকা এবং ঠাকুরগাঁও চিনিকলের জন্য ৪৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব অর্থে এ দুই চিনিকলের পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত এবং নতুন যন্ত্রপাতি কেনা হবে। চিনিকলে বিদ্যুৎ কো-জেনারেশন করা হবে। এতে নিজস্ব কারখানায় ব্যবহারের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। এ ছাড়া অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধিত চিনি উৎপাদনে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এ দুই কারখানায় মোলাসেস থেকে ইথানল বানানো হবে। বায়োগ্যাস উৎপাদন হবে। এর সঙ্গে সার বানানো হবে। এসব সার আখ এবং সুগার বিট উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে। সুগার বিট ‘চিলার স্টোরেজ’ নির্মাণ করে সংরক্ষণ করা হবে, যা বিভিন্ন চিনিকলের চাহিদামতো সারা বছর ব্যবহার করা হবে।

এ কে এম দেলোয়ার বলেন, চিনি উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে আখের পাশাপাশি সুগার বিট এবং অপরিশোধিত চিনি ব্যবহারে সারা বছর উৎপাদনে থাকবে সরকারি ১৫ চিনিকল। বহু পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত এবং নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এসব কারখানায়। আখে চিনি আহরণের মাত্রা ৮ শতাংশের ওপরে আসবে। এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সরকারি চিনিকলের লোকসান কাটিয়ে উঠে লাভজনক করা সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।

http://www.kalerkantho.com/print-edition/industry-business/2017/10/04/549601


Share with :
Facebook Facebook